টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত

স্বাস্থ্য

আজকের এই লেখায় মূল টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, বাচ্চাদের টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও প্যারা টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সময়ে দেখা দেয় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ। এ সময়ে ছড়ায় এমনি মারাত্মক একটি রোগের নাম টাইফয়েড। টাইফয়েড রোগটি পানিবাহিত। প্যারাটাইফি জীবাণু ও সালমনেলা টাইফি থেকে টাইফয়েড রোগ হয়ে থাকে।

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ সমূহ

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত

প্রচণ্ড মাথাব্যথা, গলাব্যথা, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, পেটব্যথা, জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ফারেনহাইট, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, চামড়ায় লালচে দানা দেখা দেওয়া ইত্যাদি টাইফয়েডের প্রাথমিক লক্ষণ। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই জ্বর প্রথম সপ্তাহে ধরা পড়ে না। দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সপ্তাহে জ্বর ধরা পড়ে এবং মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ওষুধ চলা অবস্থায়ও সপ্তাহ খানেক এই জ্বর থাকতে পারে।

সাধারণত রোগ-জীবাণু শরীরে প্রবেশের ১০-১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ সমূহ প্রকাশ পেতে থাকে। জ্বর এ রোগের প্রধান লক্ষণ যেটা প্রথম চার-পাঁচ দিন জ্বর বৃদ্ধি পায় জ্বর কখনো বাড়ে, কখনো কমে; তবে কোনো সময় সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় না। টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ সমূহ নিম্নরুপঃ

  • ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত টানা জ্বর হওয়া।
  • জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা ও শরীর ব্যথা দেখা দিতে পারে।
  • দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর পিঠে ও পেটে গোলাপি রঙের দানা দেখা দিতে পারে।
  • গা ম্যাজ ম্যাজ করা সহ রোগীর কাশি হতে পারে ।
  • প্রচণ্ড পেট ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
  • ক্ষুধামন্দা হওয়া সহ কারো কারো কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া এবং বমি হতে পারে।
  • কারো কারো জ্বরের সঙ্গে কাশিও হয়।
  • ওষুধ চলা অবস্থায় সপ্তাহ খানেক জ্বর থাকতে পারে।
  • হৃদস্পন্দন বা হার্ট রেট কমে যেতে পারে।

বাচ্চাদের টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ কি

সাধারণত টাইফয়েডের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে জ্বর আসা। অবিলম্বে সঠিক চিকিৎসা না করালে কিন্তু এই জ্বরটাই বেশ কিছুদিন ধরে থাকতে পারে। জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি এবং মাথাব্যাথার মতো আনুষঙ্গিক সমস্যাও হতে পারে। 

এছাড়া টাইফয়েডের অন্যান্য উপসর্গগুলি হল পেট খারাপ হওয়া বা পেটব্যথা, বমি এবং কাশি। সাধারণত টাইফয়েড হওয়ার ৫-৬ দিন বাদে এক ধরনের কাশি শুরু হয়, যেটাকে বলে ব্রঙ্কাইটিস। টাইফয়েডের ব্যাক্টিরিয়া শরীরে প্রবেশ করার ৫-১০ দিন পরে এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়। সময়ে ঠিকঠাক চিকিৎসা না হলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। 

রোগটি বাড়াবাড়ির পর্যায় চলে গেলে অন্ত্র ফুটো হয়ে যেতে পারে বা ছিঁড়ে যেতে পারে। এমনকী হেমারেজও হতে পারে! ডাক্তারি পরিভাষায় এটাকে বলা হয় ইনটেস্টিনাল পারফোরেশন অ্যান্ড হেমারেজ। টাইফয়েডের জীবাণুটি অনেক সময় মানুষের গল ব্লাডারে বাসা বাঁধে। এখানে একটা কথা আপনাদের মনে রাখা দরকার। অনেকের টাইফয়েড সেরে যাওয়ার পরেও গল ব্লাডারে টাইফয়েডের জীবাণু থেকে যেতে পারে। গল ব্লাডার থেকে এই জীবাণু স্টুল বা ইউরিনের মাধ্যমে বেরিয়ে অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।

প্যারা টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

টাইফয়েড জ্বর

টাইফয়েড সম্পর্কে কমবেশি প্রায় সবারই জানা আছে কিছু কিছু। কিন্তু প্যারা টাইফয়েড সম্পর্কে সবার খুব একটা ধারণা নেই। টাইফয়েড ধরনের জ্বর হলেও এই প্যারা টাইফয়েড রোগের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য আছে মূল টাইফয়েডের। সে কারণে প্যারা টাইফয়েডের ক্ষেত্রে ভুলভাবে রোগ নির্ণয় এবং ভুল চিকিৎসার আশঙ্কাও বেশি।

প্যারা টাইফয়েডের জীবাণু মূল টাইফয়েডের মতোই

টাইফয়েডের কারণ যেই জীবাণু সালমোনেলা টাইফি, সেই গোত্রের অন্য জীবাণু দিয়ে হয় প্যারাটাইফয়েড। তবে এক্ষেত্রে তিন ধরনের জীবাণু দায়ী হতে পারে। এগুলো হলো প্যারাটাইফি এ, বি, সি এবং সালমোনেলা । 

টাইফয়েডের জীবাণুর মতো এই জীবাণুও দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বন্যা, বা সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। টাইফয়েডের জীবাণুর মতোই এগুলো খাবার অথবা পানির মাধ্যমে প্রথমে অন্ত্রে পৌঁছে এবং অন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। তারপর এই জীবাণু যখন রক্তে পৌঁছায়, তখন দেখা দেয় জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ।

এটি টাইফয়েডের তুলনায় মৃদু

প্যারা টাইফয়েডের উপসর্গগুলো টাইফয়েডের মতোই। তবে এটা তীব্রতায় একটু কম। অসুস্থতার মেয়াদও কিছুটা কম। জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, অরুচি, একটু কাশি ইত্যাদি হলো লক্ষণ।

জটিলতা কম, তবে নেই যে তা নয়

মারাত্মক জটিলতা বা প্রাণসংহারী সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা ১ শতাংশেরও কম এই রোগের, যদি কেউ সঠিক চিকিৎসা নেয়। সাধারণত রক্ত অথবা মল পরীক্ষা বা কালচার করে প্যারাটাইফি জীবাণু পাওয়া গেলে ১০-১৪ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়। 

তবে অ্যান্টিবায়োটিক পূর্ণ মেয়াদে ও সঠিক মাত্রায় ও সময়সূচি মেনে খাওয়াটা জরুরি, নাহলে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। কখনো কখনো জীবাণু রোগীর দেহে থেকে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ক্যারিয়ার স্টেট। এরা তখন মলের মাধ্যমে রোগজীবাণু ছড়ায়। মাঝেমধ্যে নিজেরাও পেট খারাপ, মৃদু জ্বর ইত্যাদি উপসর্গে আক্রান্ত হয়।

সচেতনতা জরুরি

বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েড রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। গবেষণা বলছে, কেবল শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং খাদ্য গ্রহণ অথবা প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাসই অনেকাংশে এসব রোগের হার কমিয়ে দিতে পারে।


আমাদের আরো ব্লগ

শেয়ার করুন