টাইফয়েড রোগীর যত্ন

টাইফয়েড রোগীর যত্ন

স্বাস্থ্য
শেয়ার করুন

আজকের লেখায় টাইফয়েড রোগীর যত্ন কিভাবে নেয়া যায়, কি খাওয়া নিষেধ ইত্যাদি ব্যাপারে বিস্তারিত লিখবো। সালমোনেলা টাইফি নামের এক প্রকার ব্যাক্টেরিয়া, যা অন্ত্র এবং রক্তে বৃদ্ধি পায় তখন এই জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং টাইফয়েডের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে।

এর কারণে অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ, পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ, পিত্তথলিতে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ, নিউমোনিয়া, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোড়া, স্নায়বিক সমস্যা এমনকি কিডনিতেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

টাইফয়েড রোগটি পানিবাহিত। সালমনেলা টাইফি এবং প্যারাটাইফি জীবাণু থেকে টাইফয়েড রোগ হয়ে থাকে। টাইফয়েড প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা করলে এর গুরুতর জটিলতা এড়ানো যায়। দূষিত পানি, খাদ্য এবং দুধের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরের খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে। তা ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এবং পানির মাধ্যমেও এই রোগের জীবাণু ছড়ায়!

টাইফয়েড রোগীর যত্ন নিতে ঘরোয়া উপায়

টাইফয়েড রোগ

১। প্রচুর পানি পান করতে হবে

টাইফয়েড হলে যতটা সম্ভব বেশি পরিমাণে পানি পান করতে হবে। অবশ্য শুধু পানি নয়, এরসঙ্গে যেকোনো তরল খাবার খেতে পারেন। ফলের রস অথবা হার্বাল চা-ও থাকতে পারে তালিকায়।

টাইফয়েড থেকে ডাইরিয়া হবার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তা যাতে না হয় সেজন্য তরল খাবার খাওয়া প্রয়োজন। যেকোনো ফলের রস এক্ষেত্রে কার্যকরী হতে পারে। তরল যত বেশি শরীরে ঢুকবে, ততই শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। ফলে শরীর সুস্থ হবে তাড়াতাড়ি।

২। আদা

শরীরের যেকোনো রকম সমস্যায় আদা সবচেয়ে উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রক্তকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।

কিডনি থেকে অযাচিত পদার্থ বের করে দিতেও আদা সাহায্য করে। ফলে শরীর পরিষ্কার হয়। সবচেয়ে উপকারী হলো কাঁচা আদা বা অর্ধেক রান্না করা আদা। এতে গুণাগুণও বেশি থাকে। তাই টাইফয়েডের সময় আদা যত শরীরে ঢুকবে, ততই ভাল।

৩। তুলসীপাতা

অনেক রোগের ওষুধ হলো এই তুলসী। টাইফয়েডের জন্য এটা খুব সাধারণ ঘরোয়া ওষুধ। তুলসী অনেক আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতেও কাজে লাগে। টাইফয়েডেও এই পথ্যটি যথেষ্ট উপকারী।

গরম জলে প্রথমে তুলসী পাতা হালকা করে ফুটিয়ে নিতে হবে। এতে বাইরের ধুলোবালি চলে যাবে। তারপর অল্প মধু অথবা আদার রস অথবা গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে তুলসী পাতা খাওয়া যেতে পারে। টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়া তাড়াতেও খুব সাহায্য করে তুলসী।

৪। অ্যাপেল সিডার ভিনিগার

অ্যাপেল সিডার ভিনিগারে প্রচুর অ্যাসিডিক উপাদান থাকে। জ্বর কমাতে সাহায্য করে এই অ্যাপেল সিডার ভিনিগার। দেহ থেকে উত্তাপ বের করে এটি। টাইফয়েড মানেই জ্বর। এটি একটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে বেশি জ্বর হলে অ্যাপেল সিডার ভিনেগার দেওয়া যেতে পারে। ডাইরিয়াকেও আটকায় এই ঘরোয়া টোটকাটি। দেহের পুষ্টি বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে।

৫। ঠান্ডা পানির জলপট্টি

বেশি জ্বর হলে ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মাথায় দিয়ে রাখতে হবে। অর্থাৎ বেশি বেশি করে জলপট্টি দিতে হবে। দেহের তাপমাত্রা আরো বেড়ে গেলে অবশ্য এতে আর কাজ হয় না। তখন ঠান্ডা পানিতে মাথা ধুয়ে নিতে হবে। ঠান্ডা পানি দিয়ে কাপড় ভিজিয়ে সারা শরীর মুছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে জ্বর খুব তাড়াতাড়ি নেমে যায়।

টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে করণীয়

টাইফয়েড রোগীর যত্ন কিভাবে

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টাইফয়েড জ্বরের জন্য নির্ধারিত ভ্যাক্সিন বা টিকা গ্রহণ করা রোগটি থেকে বেঁচে থাকার একটি উপায়। ইনজেকশন এবং মুখে খাওয়ার উভয় ধরনের টিকা বাজারে পাওয়া যায়।

ভ্যাক্সিন গ্রহণ করার ব্যাপারে অবশ্যই চিকিৎসককের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সব সময়  ভ্যাক্সিন ১০০% কার্যকর হয়না সেজন্য ভ্যাক্সিনের পাশাপাশি নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা দরকারঃ

  • খাবার গ্রহণ, প্রস্তত অথবা পরিবেশনের পূর্বে খুব ভালভাবে হাত ধৌত করতে হবে।
  • শাকসবজি, ফলমূল এবং রান্নার বাসনপত্র পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে।
  • বোতলজাত, পরিশোধিত অথবা ফুটানো পানি হতে বরফ তৈরি করা না হলে সেই বরফ মিশিয়ে পানি অথবা অন্য কোন পানীয় পান করা হতে বিরত থাকতে হবে।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুটানো পানি অথবা পরিশোধিত পানি সংরক্ষণ করতে হবে এবং পানি যাতে দূষিত হতে না পারে সেই জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণকৃত সেই পানি পান করা উচিত।
  • খাবার ভালভাবে রান্না অথবা সিদ্ধ করে তারপর খাওয়া উচিত।
  • সবসময় টয়লেট পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • রাস্তার পার্শ্বস্থ দোকানের পানি পান করা এবং খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত।
  • টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুকে পরিষ্কার করার পূর্বে, খাবার প্রস্তুত অথবা পরিবেশন করার পূর্বে, নিজে খাওয়ার পূর্বে অথবা শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে যেসব খাদ্য গ্রহণ করবেন না

টাইফয়েড রোগীর যত্ন নিতে

এখানে এমন কিছু খাদ্যের বিষয়ে আলোচনা করা হবে যেগুলো টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে গ্রহণ করা ঠিক নয় বলে মনে করা হয়। সেগুলো হলো,

১। ঝাঁঝাঁলো গন্ধ যুক্ত খাদ্য বিশেষত রসুন, পিঁয়াজ ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিৎ। কারণ এইসব খাদ্য গুলি শরীরে জ্বালাভাব অথবা প্রদাহের সৃষ্টি করে।

২। এই সময় উচ্চ মাত্রায় ফাইবার যুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা শরীরের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক বলে মনে করা হয়। কারণ অধিক ফাইবার যুক্ত খাদ্য এই সময়ে হজম শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

টাইফয়েড থেকে বাঁচার মূলমন্ত্র হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। যারা নিয়মিত ভ্রমণ করেন তাদেরকে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় খেতে হয়। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি পান এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সবসময় নিশ্চিত করা সম্ভব না। যার ফলে টাইফয়েডে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই টাইফয়েড প্রবণ এলাকা পরিদর্শন করলে অবশ্যই বাইরের খাবার খাওয়া এবং পানি পান করার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

৩। বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি সবজি এই সময়ে গ্রহণ করা ঠিক নয় কারণ এগুলি গ্রহণের ফলে পেট ফাঁপার সম্ভাবনা রয়েছে।

৪। বেশি মাত্রায় ফ্যাটযুক্ত খাদ্য গ্রহণ এই সময় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক হয়। তাই ঘি, মাখন, বেশি তৈলাক্ত খাদ্য ইত্যাদি এড়িয়ে চলা দরকার।

৫। বেশি তেল মশলাযুক্ত খাদ্য বিশেষত লঙ্কা, হট সস, মরিচ ইত্যাদি একদমই পরিত্যাগ করা উচিৎ।

৬। এই সময় অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার অথবা শর্করা যুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলা উচিৎ কারণ এগুলি পাকস্থলীর ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করে।

টাইফয়েড নিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর

টাইফয়েড কি ছোঁয়াচে রোগ?

আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এবং পানির মাধ্যমেও টাইফয়েড রোগের জীবাণু ছড়ায়। এই রোগের জটিলতাও নেহাত কম নয়। রক্তক্ষরণ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ, অগ্নাশয়ে প্রদাহ, এমনকি কিডনিতেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে টাইফয়েড থেকে। টাইফয়েড রোগটি পানিবাহিত জীবাণুর মাধ্যমে ছড়ায়।

টাইফয়েড জ্বর হলে কি গোসল করা যায়?

ঘাড় এবং কপালের পেছনের অংশে জলপট্টি দেওয়া জ্বর কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। পুরোপুরি গোসলের পরিবর্তে কুসুম গরম পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে শরীর মোছাও দ্রুত জ্বর কমাতে সাহায্য করে। চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া অবশ্যই জ্বর নিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা যাবে না। তা নাহলে শরীরে কাঁপুনি দেখা দিতে পারে এবং জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে।

টাইফয়েড জ্বর কতদিন থাকে?

প্রধানত এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে ডাক্তাররা টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা করে থাকেন। নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক শুরুর পরেও জ্বর কমতে ৫ দিনও লেগে যেতে পারে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা না নিলে জ্বর সপ্তাহ বা মাসব্যাপী থাকতে পারে।


আমাদের আরো ব্লগ পড়ুন