হিসাব বিজ্ঞান

হিসাব বিজ্ঞান কি এবং কাকে বলে

শিক্ষালয়

হিসাব বিজ্ঞান হল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যবসার আর্থিক এবং অনার্থিক তথ্য পরিমাপণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও যোগাযোগের মাধ্যম। হিসাব বিজ্ঞানের আধুনিক শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বেনেডিক্ট কটরুলজেভিক কর্তৃক, ১৪৫৮ সালে। 

১৪৯৪ সালে ব্যবসায়ী, কুটনীতিক, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং মানবসেবী দুব্রভনিক (ক্রোয়েশিয়া) এবং ইতালিয়ান গণিতবিদ লুকা প্যাসিওলি ব্যবসায়ের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, হিসাব বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকান্ডের ফলাফল পরিমাপ করে এবং এই তথ্য ব্যবসা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারী, যেমন – বিনিয়োগকারী, ব্যবস্থাপনা, ঋণদাতাএবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দিয়ে থাকে। হিসাব বিজ্ঞান চর্চাকারীদেরকে হিসাববিদ বলা হয়। হিসাববিজ্ঞান ও আর্থিক প্রতিবেদন করণ প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

হিসাব বিজ্ঞান কি?

হিসাববিজ্ঞান কাকে বলে

সাধারণ এবং প্রচলিত ধারণা অনুযায়ীঃ

বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কারবারি লেনদেনসমূহকে লিপিবদ্ধ করার কৌশলকে হিসাব বিজ্ঞান বলে। 

হিসাববিজ্ঞানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে নিম্নোক্তভাবে হিসাববিজ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করা যেতে পারেঃ 

কারবারের লাভ-ক্ষতি এবং আর্থিক অবস্থা নির্ধারণের জন্য বিজ্ঞান সম্মতভাবে কারবারি লেনদেনসমূহকে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করার কৌশলকে হিসাব বিজ্ঞান বলে।

হিসাবশাস্ত্রবিদ ‘ডব্লিউ জনসন’ হিসাব বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় বলেছেনঃ

‘অর্থের অংকে ব্যবসায়ের বিভিন্ন লেনদেনসমূহ সংগ্রহকরণ, সংবদ্ধকরণ,লিপিবদ্ধকরণ, আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিকরণ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এই সব ধরনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও বিশদ ব্যাখ্যা করে যথাযথ তথ্য যোগানক হিসাব বিজ্ঞান বলে।’

সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্তভাবে হিসাব বিজ্ঞানের সংজ্ঞা প্রদান করা যেতে পারেঃ

কারবারের মালিক, ব্যবস্থাপক এবং কারবারের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষসমূহের কারবার সম্পর্কে সঠি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে কারবারের লেনদেনগুলোকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে লিপিবদ্ধকরণ, শ্রেণীবদ্ধকরণ,সংক্ষিপ্তকরণ, আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতকরণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের কার্যক্রমকে হিসাববিজ্ঞান বলে।

যে কৌশল অথবা পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল (লাভ কিংবা ক্ষতি) এবং আর্থিক অবস্থা (সম্পদ এবং দায়) সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় সে কৌশল বা পদ্ধতিকে হিসাব বিজ্ঞান বলে।

হিসাবশাস্ত্র অথবা হিসাববিজ্ঞান বা অ্যাকাউন্টিং হলো একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবৃতি তৈরী করার বিজ্ঞান।হিসাব বিজ্ঞানী বা একাউন্টেন্টরা মূলত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, আয়-ব্যয়, দেনা এবং নগদ প্রবাহের বিবরণী অর্থমূল্যে প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানের উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। হিসাব বিজ্ঞানের মূলনীতিগুলো সাধারণত হিসাব সংরক্ষণ এবং হিসাব নিরীক্ষণে প্রয়োগ করা হয়।

ও‌য়ে‌গেন্ট, কাইসু এবং কি‌মে‌লের ম‌তেঃ

প্র‌তিষ্ঠা‌নের (ব্যবসা‌য়িক কিংবা অব্যবসা‌য়িক) অর্থ‌নৈ‌তিক ঘটনাসমুহ শনাক্তকরন, ‌লি‌পিবদ্ধকরন এবং আগ্রহী ব্যবহারকারী‌দের নিকট সেই তথ্য সরবরাহ করা এ তিন‌টি পক্রিয়াই হিসাব‌বিজ্ঞান

পণ্য ক্রয়, বিক্রয়, মজুদকরণ, হিসাব নিকাশ, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সহ ব্যবসায়ের অন্যান্য সব ধরনের হিসাব সংরক্ষনের জটিল এবং ক্লান্তিকর কাজগুলো আজকাল কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে অনেক দ্রুততার সাথে করা যায়। এই সফটওয়্যার গুলো সচরাচর প্রত্যেকটি প্রধান কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত থাকে; এতে করে একটি তথ্য প্রবেশ করালে তা সমস্ত হিসাবে অটোমেটিক অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই সফটওয়্যার দিয়ে একজন কর্মী প্রায় ২০০ মানুষের কাজ একাই করে ফেলতে পারে। এই ধরনের একাউন্টিং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের কাজ অনেক সহজ করে দেয় এবং এর মাধ্যমে পণ্য ও সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অর্থ সাশ্রয় হয়।

হিসাব বিজ্ঞান প্রায় হাজার বছর ধরে চর্চিত একটি বিদ্যা। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় উৎপাদিত ফসল এবং মন্দিরে সংগৃহীত শস্যের হিসাব রাখার জন্য হিসাববিজ্ঞানের প্রাচীনতম পন্থাগুলো ব্যবহৃত হতো।

হিসাব কাকে বলে

হিসাববিজ্ঞান

সংক্ষেপে হিসাব হলো লেনদেনগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করে ভিন্ন শিরোনামের অধীনে প্রস্তুতকৃত সংক্ষিপ্ত বিবরণী। দৈনন্দিন ঘটে থাকা লেনদেনগুলো বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত পক্ষগুলোকে পৃথক শিরোনামে সংক্ষিপ্ত বিবরণী প্রস্তুত করা হয় এই প্রত্যেকটি বিবরণীকে একেকটি হিসাব বলা হয়। 

হিসাব প্রস্তুতের মাধ্যমে আমরা একটি নির্দিষ্ট সময় পরে কোন একটি নির্দিষ্ট হিসাবের সঠিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারি। বিস্তারিত ভাবে যদি বলা হয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি, দায়, আয় ও ব্যয় সংক্রান্ত একই ধরনের লেনদেন গুলোকে হিসাব বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত শিরোনামের অধীনে সাজিয়ে যে সংক্ষিপ্ত এবং শ্রেণিবদ্ধ বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাকে হিসাব বলে।

হিসাব বিজ্ঞানের স্বর্ণ সূত্র কি

হিসাব বিজ্ঞান কাকে বলে

লেনদেনকে হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করবার জন্য দু’তরফা দাখিলা পদ্ধতি অনুসারে ডেবিট এবং ক্রেডিট করতে হয়। ডেবিট এবং ক্রেডিট করার প্রাচীনতম এই নিয়মকে স্বর্ণসূত্র বলা হয়। এই সূত্র অনুযায়ী লেনদেন ডেবিট এবং ক্রেডিট করার জন্য হিসাবকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়,

হিসাবডেবিট/ক্রেডিট
ব্যক্তিবাচক হিসাবব্যক্তি গ্রহিতা …………………..…ডেবিট
ব্যক্তি দাতা……………………..…ক্রেডিট
সম্পত্তিবাচক হিসাবসম্পত্তি বৃদ্ধি পেলে ………………ডেবিট
সম্পত্তি কমে পেলে ………………ক্রেডিট
আয়-ব্যয় বাচক হিসাবসকল খরচ বা ক্ষতি…………. ডেবিট
সকল আয় বা লাভ……………ক্রেডিট

১৪৯৪ সালে ইতালীর গণিতবীদ দার্শনিক লুকা ডি প্যাসিওলি প্রতিটি লেনদেনকে দুটি পক্ষে লিখে রাখতেন সঠিক হিসাব নির্ণয়ের জন্য যার নাম ছিলো দুতরফা দাখিলা পদ্ধতি। বর্তমানে এই দুতরফা দাখিলা পদ্ধতির নাম করণ করা হয় ডেবিট এবং ক্রেডিট।

নিচে ডেবিট এবং ক্রেডিট নির্ণয় করা হলোঃ

১| সম্পদ বাড়লে ডেবিট এবং কমলে ক্রেডিট

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সম্পদ বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। 

যেমন, আসবাবপত্র ক্রয় করা হলো সম্পদ বাড়ছে আবার বিক্রি করা হলো সম্পদ কমে গেছে।

২| দায় বাড়লে ক্রেডিট এবং কমলে ডেবিট

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দায় বাড়তেও পারে কমতেও পারে। যেমন, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ দায় বাড়ছে আবার ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করায় দায় কমে গেছে।

৩| মালিকানাস্বত্ব বাড়লে ক্রেডিট এবং কমলে ডেবিট

ব্যবসায় পরিচালনায় মালিকানাসত্ব বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। যেমন, মালিক কর্তৃক মূলধন বিনিয়োগ মালিকানাস্বত্ব বাড়ছে আবার মালিক কর্তৃক উত্তোলন মালিকানাস্বত্ব কমে গেছে।

৪| আয় বাড়লে ক্রেডিট এবং কমলে ডেবিট

ব্যবসায় পরিচালনায় আয় বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। যেমন, পন্য বিক্রি করা হলে আয় বাড়ছে আবার কর্মচারীর বেতন প্রদান করা হলো আয় কমে গেছে অর্থাৎ ব্যয় হয়েছে।

৫| ব্যয় বাড়লে ডেবিট এবং কমলে ক্রেডিট

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। যেমন, দোকান ভাড়া দেওয়া হলো ব্যয় বাড়ছে এবং তার বিপরীতে ব্যয় কমতেও পারে।

এ পদ্ধতিতে ডেবিট এবং ক্রেডিট সহজে নির্ণয় করা যায় এবং এই সূত্রকে হিসাব বিজ্ঞানের ভাষায় স্বর্ণ সূত্র বলা হয়।

আর্থিক হিসাব বিজ্ঞান কি এবং ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান কি?

আর্থিক হিসাববিজ্ঞান অথবা Financial Accounting বলতে একাউন্টিং এর সেই শাখাকে বুঝায় যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্দিষ্ট হিসাবকাল শেষে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আয়-ব্যয়, সম্পদ -দায়ের পরিমাণ নির্ণয় করে এবং সেই তথ্য ইন্টারেস্টেড ইউজারস্ এর কাছে প্রদান করা। যেমন-প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারস,সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ, পটেনশিয়াল ইনভেস্টরস ইত্যাদি।

আর্থিক হিসাব বিজ্ঞানের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মূলত ইনভেস্টররা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এটি হিসাববিজ্ঞানের একটি শাখা। অর্থাৎ হিসাববিজ্ঞানের যেই শাখায় অর্থনৈতিক (ফিন্যান্সিয়াল) এবং আর্থিক তথ্যসমূহ বিনিয়োগকারী, পাওনাদার ও অন্যান্য বাহ্যিক পক্ষ সমূহকে সরবরাহ করা হয় তাকে আর্থিক হিসাব বিজ্ঞান বলে।

অন্যদিকে সোজা বাংলায় ব্যবস্থাপনা হিসাব বিজ্ঞান বা Management Accounting হলো ব্যবস্থাপকদের প্রদান করা তথ্য। অর্থাৎ ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত গ্রহনের উদ্দেশ্য কিছু তথ্য ইন্টারন্যালি ম্যানেজমেন্টকে প্রদান করা হয় যেটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। 

ধরুন আপনার প্রতিষ্ঠানের লেবারদের (শ্রমিক) আপনি তাদের কর্মদক্ষতার ওপর তাদের পারিশ্রমিক অথবা বোনাস নির্ণয় করেন।সুতরাং এক্ষেত্রে তাদের কাজের মূল্যয়নের ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে ব্যবস্থাপক হিসাববিজ্ঞান।

হিসাব বিজ্ঞান এর জনক কে?

হিসাব বিজ্ঞান কি

আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের জনক লুকা প্যাসিওলি (১৪৪৫-১৫১৭)। তার পুরো নাম ফ্রা লুকা বার্তোলোমিয়ো দা প্যাসিওলি। জন্ম ইতালির সানসিপলক্রোতে। 

লুকা প্যাসিওলি ইতালিতেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষার বদলে ব্যবসা শিক্ষায় তিনি মনোনিবেশ করেন। গণিতের শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। পরে অবশ্য শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। 

তিনি একজন ধর্মযাজকও ছিলেন। ১৪৯৪ সালে তাঁর প্রথম বই ‘সুম্মা এরিথমেটিকা জিওমেট্রিকা প্রপোরশনিয়েট প্রপোরশনালিটা’ প্রকাশ করেন। হিসাব বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন এই বইটিতে। এই বইতে তিনি ব্যাখ্যা দেন হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি দুই তরফা দাখিলা পদ্ধতি নামে একটি হিসাব খাত নিয়েও। যেটাকে হিসাব বিজ্ঞানের স্বর্ণসূত্রও বলা হয়।

আধুনিক হিসাব বিজ্ঞানের উৎপত্তি কোথায়?

আধুনিক হিসাব বিজ্ঞানের উৎপত্তি হয় ইতালিতে। ১৪৯৪ সালে ইতালিয়ান গনিতবিদ লুকা প্যাসিওলি গণিত শাস্ত্রের (সুম্মা ডি এরিথিমেটিকা, জিওমেট্রিকা, প্রপোরসোনিয়েট, প্রোপোরসনালিটা) উপর একটি বই লেখেন। এই বইয়ের ৫ তম অধ্যায়ে তিনি হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি দুতরফা দাখিলা পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেন।


আমাদের আরো ব্লগ পড়ুন

শেয়ার করুন