জানাজার নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও সুন্নত

ইসলাম

আজকের এই লেখায় আমরা জানাজার নামাজের নিয়ম নিয়ে কথা বলবো। প্রত্যেক মানুষকে একদিন না একদিন পরপারে যেতে হবে। যে শিশুটির আজ জন্ম হলো তাকেও একদিন এই সুন্দর পৃথিবী ছাড়তে হবে, যেতে হবে পরপারে। এই নির্দিষ্ট সময়ের পৃথিবীটি মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা কেন্দ্র।

কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার আগে অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রার্থনাকে বলা হয় জানাজা নামাজ। ইসলাম ধর্মামলম্বীদের বা মুসলমানদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া অথবা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব। অর্থাৎ কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে আবশ্যিকভাবে জানাজার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো গোত্র কিংবা এলাকার পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেন‚ “যে মুসলিম মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করে নাই এমন ৪০ জন ব্যক্তি নামাজ আদায় করবে‚ তবে মৃত ব্যক্তির সম্পর্কে তাদের সুপারিশ আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন।” (মুসলিম)

জানাজার নামাজের জন্য লাশ কিবলার দিকে রাখতে হবে। যদি লাশ পুরুষ হয়‚ তবে মাথার পাশের দিকে (বরাবর) ইমাম সাহেব দাঁড়াবেন। আর মহিলা হলে মধ্যবর্তী/মাঝামাঝি স্থানে দাঁড়াবেন, এটাই মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সুন্নত।

তাহলে চলুন জানাজার নামাজের নিয়ত, নিয়ম, সুন্নত ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নেই।

জানাজার নামাজ

জানাজার নামাজ হলো একজন ইমামের নেতৃত্বে দলবদ্ধভাবে অথবা জামাতের সাথে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে অংশগ্রহণকারীরা বেজোড় সংখ্যক কাতারে কিংবা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এই নামাজ আদায় করেন। এটি ৪ তাকবিরের নামাজ। 

এই নামাজ দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয় এবং সালাম ফেরানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সাধারণত জানাজার নামাযের শেষে মুনাজাত কিংবা দোয়া করতে হয় না কারণ ইসলামের বিধান অনুযায়ী এই নামাযের মাধ্যমেই মৃত মানুষের জন্য দোয়া করা হয়। জানাজা শেষে মৃত ব্যক্তিকে দ্রুত গোরস্থানে নিয়ে যেতে হয় এবং ইসলামী রীতিতে কবর তৈরি করে মাটির নিচে দাফন করতে হয়।

জানাজার নামাজের নিয়ম

এখন আমরা জানাজার নামাজের নিয়ম নিয়ে জানবো। জানাজার নামাজ হলো ফরজে কিফায়া। এই নামাজ মুসল্লিদের জন্য সওয়াব বর্ধন এবং মৃত ব্যক্তির জন্য সুপারিশ। জানাজায় লোক সংখ্যা বেশি হওয়া মুসল্লির সংখ্যা এবং মুস্তাহাব যত বাড়তে ততই উত্তম। 

তবে কাতার বেজোড় হওয়াটা উত্তম। জানাজার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য ইস্তেগফার এবং দোয়া। নিচে জানাজার নামাজ পড়ার পদ্ধতি তুলে ধরা হলো‚

১. প্রথমত মৃত ব্যক্তিকে ক্বিবলার দিক করে মুসল্লিদের সম্মুখে রেখে ইমাম ও মুসল্লিদের জানাজার নামাজের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে হবে।

২. মুসল্লীরা নামাজের অজুর মতো করে অজু করে ইমামের পিছনে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে।

৩. মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে ইমাম সাহেব তার মাথার পাশে দাঁড়াবেন। আর মহিলা হলে কফিনের মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়াবেন। তবে মৃত ব্যক্তির মাঝ বরাবর দাঁড়ানোতে অবশ্য কোনো দোষ নেই।

৪. তারপর জানাজার নিয়ত করে চার তাকবিরের সহিত নামাজ আদায় করতে হবে।

৫. কাঁধ বা কানের লতি পর্যন্ত দু’হাত তুলে আল্লাহু আকবার বলে নিয়ত বাঁধতে হবে।

৬. অন্যান্য নামাজের মতোই ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে হবে।

৭. ছানা পড়তে হবে। তবে অনেকে সুরা ফাতিহা পড়ে অন্যান্য সুরা মিলানোর কথা উল্লেখ করেছেন।

৮. দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরূদে ইবরাহিম পড়তে হবে।

৯. তৃতীয় তাকবির দেয়ার পর ইখলাসের সঙ্গে হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলোর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হবে।

১০. চতুর্থ তাকবির দিয়ে যথাক্রমে ডানে এবং বামে সালাম ফিরানোর মাধ্যমে জানাজার নামাজ শেষ করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নিজেদের সাওয়াব বৃদ্ধিতে এবং মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনায় সুন্দরভাবে জানাজার নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন।

জানাজার নামাজের নিয়ত

এতক্ষণ জানাজার নামাজের নিয়ম জানলেন। এখন জানাজার নামাজের নিয়ত বাংলা উচ্চারণসহ (Janajar niyot bangla) নিচে দেয়া হলো,

نَوَيْتُ اَنْ اُؤَدِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ تَكْبِيْرَاتِ صَلَوةِ الْجَنَا زَةِ فَرْضَ الْكِفَايَةِ وَالثَّنَا ءُ لِلَّهِ تَعَا لَى وَالصَّلَوةُ عَلَى النَّبِىِّ وَالدُّعَا ءُلِهَذَا الْمَيِّتِ اِقْتِدَتُ بِهَذَا الاِْمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ

নিয়তের বাংলা উচ্চারণঃ “নাওয়াইতু আন উয়াদ্দিয়া লিল্লাহে তায়ালা আরবা আ তাকবীরাতে ছালাতিল জানাজাতে ফারজুল কেফায়াতে আচ্ছানাউ লিল্লাহি তায়ালা ওয়াচ্ছালাতু আলান্নাবীয়্যে ওয়াদ্দোয়াউ লেহাযাল মাইয়্যেতে এক্কতেদায়িতু বিহাযাল ইমাম মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতে আললাহু আকবার।”

এখানে নিয়তে ‘লেহাযাল মাইয়্যেতে’ পুরুষ কিংবা ছেলে লাশ হলে পড়তে হবে, আর লাশ নারী কিংবা মেয়ে হলে ‘লেহাযিহিল মাইয়্যেতে’ বলতে হবে।

নিয়ত আরবিতে করতে সম্ভব না হলে এভাবে বাংলায় করলেও চলবে‚ “আমি চার তাকবিরের সহিত ফরজে কিফায়া জানাজার নামাজ কিবলামুখী হয়ে ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে মরহুম ব্যক্তির (পুরুষ কিংবা মহিলার) জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করছি। আল্লাহু আকবার।”

জানাজার নামাজের নিয়ম ও দোয়া

জানাজার নামাজে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও রাসূলের ওপর দরুদ পাঠ করা হয়। বাংলায় নিয়ত করলে তা বাংলায় বলে অথবা মনে মনে নিয়তে আনলেও হবে।

নিয়তে তাকবীরে তাহরিমা অর্থাৎ, আল্লাহু আকবার বলার পর হাত তুলে তারপর অন্যান্য নামাজের মতো হাত বেঁধে নিতে হবে। হাত বেধে সানা পড়তে হবে।

আরবিতে সানাঃ

سُبْحَا نَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ

সানা বাংলা উচ্চারণঃ

সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।

সানা পড়ার পরে তাকবীর বলার পর দরুদ শরীফ পড়তে হবে যেটা সাধারণ নামাজে তাশাহুদের পর পড়া হয়।

দরুদ শরীফঃ

للَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ- اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَا هِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ

দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণঃ

আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা মুহাম্মাদি ওয়া আলা আলি মুম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম্মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ।

দরুদ শরীফ পড়ার পরে তৃতীয় তাকবীর আদায় করে জানাজার নামাজের দোয়া পড়তে হয়।

জানাজার নামাজের দোয়া

نَا اَللَّهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَاَحْيِهِ عَلَى الاِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الاْيمَانِ بِرَحْمَتِكَ يَا ارْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

জানাজার নামাজের বাংলা উচ্চারণঃ

আল্লাহুম্মাগফিরলি হাইয়্যেনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িইবিনা ও ছাগীরিনা ও কাবীরিনা ও যাকারিনা ও উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলামী ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ঈমান বেরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহীমিন।

তবে নাবালক ছেলের ক্ষেত্রে জানাজার নামাজের দোয়া পড়তে হবে,

اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًا وْاَجْعَلْهُ لَنَا اَجْرًا وَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا وَمُشَفَّعًا

নাবালক ছেলের জন্য জানাজার নামাজের দোয়া বাংলা উচ্চারণ,

আল্লাহুম্মাজ আল হুলানা ফারতাও ওয়াজ আল হুলানা আজরাও ওয়া যুখরাঁও ওয়াজ আলহুলানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়ান।

নাবালিকা মেয়ের ক্ষেত্রে জানাজার নামাজের দোয়া পড়তে হবে,

اللَّهُمَّ اجْعَلْهَا لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهَا لَنَا اَجْرًا وَذُخْرًاوَاجْعَلْهَا لَنَا شَافِعَةً وَمُشَفَّعَة

নাবালিকা মেয়ের ক্ষেত্রে জানাজার নামাজের দোয়া বাংলা উচ্চারণ,

আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারতাও ওয়াজ আলহা লানা আজরাও ওয়া যুখরাও ওয়াজ আলহা লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ ফায়ান।

তারপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে একটু নীরব থেকে ডানে এবং বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।

যদি কারো নামাজে আসতে দেরি হয়ে যায়‚ তবে ইমাম সাহেবকে অনুসরণ করতে হবে। সম্ভব হলে চার তাকবীর আদায় করে নিতে পারেন, তা যদি সম্ভব না হয়‚ তাহলে ইমাম সাহবকে অনুসরণ করে সালাম ফিরিয়ে নিয়ে জানাজার নামাজ সম্পন্ন করবে। জানাজার নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়‚ তাই এটি কাজা পড়ার কোনো সুযোগ নেই।

জানাজার নামাজে সুন্নত

এতক্ষণ জানলেন জানাজার নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া সম্পর্কে। এখন জানাজার নামাজের সুন্নত সম্পর্কে জেনে নেই চলুন,

১। মৃত ব্যক্তি পুরুষ হোক কিংবা নারী‚ ইমাম সাহেব তার সিনা বরাবর দাঁড়াবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১২৪৬)

২। প্রথম তাকবিরের পর ছানা পড়তে হবে। জানাজার নামাজের ছানা সাধারণ নামাজের ছানার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। 

জানাজার নামাজের সানার আরবী উচ্চারণ,

সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানা-উকাও ওয়া লা-ইলাহা গায়রুক।

৩। দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদ পড়তে হবে (আমাদের নামাজে যেই দরুদ পড়ি)।

৪। তৃতীয় তাকবিরের পর দোয়া পড়তে হবে(ইবনে আবী মায়বা ৩/২৯৫)।

জানাজার নামাজের ফজিলত

ফরজে কেফায়া হবার কারণে জানাজার নামাজ সমাজের কিছু মানুষ আদায় করলেই দায়মুক্ত হওয়া যাবে। তবে‚ কেউ যদি আদায় না করেন তাহলে একসঙ্গে সবাই পাপের ভাগীদার হবেন। সমস্যা থাকলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে একই এলাকার অন্য কেউ নামাজ পড়লে গুনাহগার হবে না।

হাদিসে রয়েছে জানাজার নামাজ পড়লে উহুদ পরিমাণ সাওয়াব আদায় হয়। তাই সুযোগ পেলে অবশ্যই এই নামাজ আদায় করা উচিত। এছাড়া একজন আত্মীয় হিসেবে এবং একজন প্রতিবেশী হিসেবে  এই নামাজ আদায় করা মুসলমানের দায়িত্ব এবং কর্তব্য।

আমাদের আরো লেখা পড়তে ভিজিট করুন এখানে। ধন্যবাদ।


আরো ব্লগ পড়ুন

শেয়ার করুন