একমালিকানা ও অংশীদারি ব্যবসার তুলনামুলক আলোচনা

ব্যবসা
শেয়ার করুন

একমালিকানা ব্যবসা নাকি অংশীদারি ব্যবসা?

আপনি একমালিকানা ব্যবসা নাকি অংশীদারি ব্যবসা করবেন তা নিয়ে আজকের লেখা। তবে লেখাটির উদ্দেশ্য মূলত এই দুইটার মধ্যে পার্থক্য বুঝানো। ব্যবসা করার আগ্রহ থাকলে কোন ব্যবসাটি আপনার জন্য উপযুক্ত এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারনা থাকা জরুরী।  একমালিকানা ব্যবসা কি আর অংশীদার ব্যবসা কি সেটা জেনে নেই।

লেখাটি যারা ব্যবসা করতে আগ্রহী তাদের যেমন উপকারে আসবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের কাছেও এই বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

ব্যবসা হিসাবে একমালিকানা ব্যবসা

সোজা কথায় যে ব্যবসার মালিক একজন সেটাকেই একমালিকানা ব্যবসা বলে। এখানে ইনভেস্টমেন্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ একজন মানুষই করে থাকেন। এর লাভ লোকসানও সেই মানুষটাই বহন করেন।

ব্যবসা হিসাবে অংশীদারি ব্যবসা

ব্যবসা

এখানে একের অধিক মালিক বা পরিচালক থাকতে পারেন। মনে করুন আপনিসহ আরো ২ জন বন্ধু মিলে চিন্তা করলেন অনলাইনে একটা বুকশপ চালু করবেন। সেই বুকশপের জন্য যাবতীয় ইনভেস্টমেন্ট,অর্ডার কালেকশন,মার্কেটিং,লাভ,লোকসান সবকিছুতেই তিনজনের পার্টসিপেশন বা অংশগ্রহন থাকবে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বলে রাখা দরকার যেটা আপনাকে সবাই সরাসরি বলবেনা। বইয়ে এ সম্পর্কীত লেখা পাবেন কিন্তু প্র‍্যাকটিক্যাল এক্সাম্পল ছাড়া সবাই এটার মানে বুঝেন না।

মনে করুন, আপনি একটা কাপড়ের ব্যবসা চালু করলেন। এখানে শুধু আপনিই মালিক,ম্যানেজার। মানে ব্যবসাটা টোটালি আপনার। আপনি ধরে নিলেন এটা আপনার একমালিকানা ব্যবসায়। কিন্তু আপনার টাকা নেই।

অন্য কেউ আপনার ব্যবসার জন্য ইনভেস্টমেন্ট করলো এবং শর্ত দিলো লাভের একটা অংশ আপনি তাকে দিতে হবে। পুরো ব্যবসাটা কিন্তু আপনার। আপনিই এর মালিক। কিন্তু শুধুমাত্র ইনভেস্টমেন্টের কারণে আপনার আড়ালেও আরেকজন আপনার ব্যবসায়ে অংশীদার হয়ে যাচ্ছে। যেটাকে বইয়ের ভাষায় নিষ্ক্রীয় বা ঘুমন্ত অংশীদার বলে।

অর্থাৎ আপনি না বুঝেই একমালিকানা থেকে আপনার ব্যবসাকে অংশীদারে নিয়ে গেলেন। সেটা লিখিত না থাকলেও ব্যাপারটা এমনই হয়ে যায়। কারণ যিনি ইনভেস্ট করলেন উনার পূর্ণ অধিকার থাকে আপনার ব্যবসায়ের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে জানার। তো এটা একমালিকানা ব্যবসা হচ্ছেনা।

কাগজে কলমে একমালিকানা হলেও এটা একমালিকানা হবেনা। কারণ কখনো না কখনো অংশীদার ব্যবসায়ের যে অসুবিধাগুলো আছে সেগুলোর সম্মুখিন হতে পারেন এমন ঘুমন্ত বা নিষ্ক্রীয় অংশীদারদের মাধ্যমে। এখন একমালিকানা এবং অংশীদারি ব্যবসায়ের সুবিধা ও অসুবিধাগুলো জানবো।

একমালিকানা ব্যবসায়ের সুবিধা

আলোচনা

একমালিকানা ব্যবসার সুবিধাগুলো হলো,

  •  এই ব্যবসায়ের মালিক একজন হয়।
  • ইনভেস্টর উনি নিজেই হোন।যদি অন্য কেউ ইনভেস্ট করেন এবং প্রফিটের অংশ দাবি করেন তাহলে এটা একপ্রকার অংশীদারি ব্যবসায়ের কাতারে চলে যায়।
  • ব্যবসায়ের যাবতীয় লাভ শুধুমাত্র উনার একার হবে।
  • নিজেই নিজের বস।কেউ খবরদারি করবেনা।
  • ব্যবসায়টির প্রতিটা সেক্টরে উনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
  • যেহেতু এখানে মালিক একজন তাই ভুল বোঝাবুঝি,অন্যের নিকট দায়বদ্ধতা এ ব্যাপারগুলো থেকে মুক্ত থাকা যায়।
  • যখন কাজের পরিমাণ বেড়ে যাবে তখন একমালিকানা ব্যবসায়ের মালিক টাকার বিনিময়ে অন্যকে হায়ার বা ভাড়া করতে পারেন কাজগুলোর জন্য।অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত কাজের প্রেশার নেয়া যায়না একমালিকানা ব্যবসায়ে। আলবৎ  নেয়া যায়। টেকনিক তো বলেই দিলাম।
  • বড় বড় ডিসিশানের জন্য কারো অনুমতি লাগেনা। এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া যায়।

একমালিকানা ব্যবসায়ের অসুবিধা

একমালিকানা ব্যবসা

একমালিকানা ব্যবসার অসুবিধাগুলো হলো,

  • ইনভেস্টমেন্ট কম হয়।
  • লস হলে পুরো লস বহন করা লাগে।এটার কারণে মাঝেমাঝে অনেক একমালিকানা ব্যবসায়ীকে পথে বসে যাওয়া লাগে।অনেকে একেবারে জানপ্রাণ দিয়ে সব ইনভেস্ট করে দেন একমালিকানা ব্যবসায়ে।তখন দেখা যায় কোনো ছোট ভুল হলেও সবকিছু হারাতে হয়।
  • সিদ্ধান্ত একা নেয়া যেমন একদিকে সুবিধা আবার এর অসুবিধাও আছে! আপনি,আমি সবাই এতটুকু বুঝি যে একা সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভুল হবার সম্ভাবনাও বেশি হয়।
  • অনেক সময় দায়বদ্ধতা না থাকায় একমালিকানা ব্যবসায়ের মালিক এগ্রেসিভ ব্যবসা করে সবকিছু হারিয়ে ফেলেন। এখানে এগ্রেসিভ ব্যবসা বলতে না বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া,বেশি লোভে পড়ে যেখানে সেখানে ডিল করে ফেলা ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে।
  • জবাবদিহিতা অনেক বড় একটা ইস্যু। একমালিকানা ব্যবসায়ে কোনো জবাবদিহীতা না থাকায় সে ব্যবসায়ে পা পিছলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ একমালিকানা ব্যবসায়ে রিস্ক অনেক বেশি।

অংশীদারি ব্যবসায়ের সুবিধা

ব্যবসায় লাভ

অংশীদারি ব্যবসায়ের সুবিধাগুলো হলো,

  • এই ব্যবসায়ের মালিক একের অধিক হন। যার কারণে লস বেশি হবার রিস্ক কম থাকে। কারণ ৫ জন মালিক হলে ১০০ টাকা লসে প্রত্যেকের মাত্র ২০ টাকা লস হবে। সেখানে একমালিকানা ব্যবসায়ে লসের পরিমাণ হবে পুরো ১০০ টাকা!
  • ইনভেস্টর একের অধিক হন। যার কারণে একজনকেই পুরো টাকা ইনভেস্ট করতে হয়না। ৫ জন মালিক মিলে ১ লক্ষ টাকা ইনভেস্ট করলে সবার ভাগে মাত্র ২০ হাজার টাকা করে পড়বে! তবে সবাইকেই যে সমান ইনভেস্ট করতে হয় তা না। যার যতটুকু সামর্থ্য ততটুকুও ইনভেস্ট করা যায়। সেক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ নির্ধারিত হয় ইনভেস্টমেন্টের টাকা অনুযায়ী।
  • যেকোনো সিদ্ধান্ত ভেবে চিন্তে সবার সাথে আলোচনা করে নেয়া যায়। একমালিকানায় আবার এই সুযোগ নাই। একমালিকানায় মাঝে মাঝে একা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়।
  • কাজের প্রেশার ভাগ হয়ে যায় সবার মধ্যে। তাই একা অতিরিক্ত প্রেশার বা ব্যবসায়ীক চাপ বহন করতে হয়না।
  • অনেক বেশি ইনভেস্টমেন্ট করা যায়।যত বেশি ইনভেস্টমেন্ট তত বেশি লাভ।

অংশীদারি ব্যবসায়ের অসুবিধা

ব্যবসার মিটিং

অংশীদারি ব্যবসায়ের অসুবিধাগুলো হলো

  • যেখানে মানুষ বেশি সেখানে সমস্যাও বেশি। অংশীদারি ব্যবসায়ও এর বাইরে নয়।এটিই অংশীদারি ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে আমার কাছে মনে হয়।
  • কোনো একজন অংশীদারের মধ্যে খবরদারি করার মানসিকতা তৈরি হলে এই ব্যবসায় সামনে এগুতে পারেনা।
  • লাভের পরিমাণ শেয়ার হয়ে যায়। তাই বেশি ইনভেস্টমেন্ট মানেই পুরো লাভ আপনার নয়। লাভ ভাগ হয়ে যাবে।
  • ডিসিশান নেয়া সহজ হলেও অংশীদারি ব্যবসায়ে ডিসিশান নিতে অনেক অনেক সময় নষ্ট হতে পারে। কারণ একের অধিক মানুষ এই ডিসিশান প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে। ভিন্ন মানুষ,ভিন্ন চিন্তা।যার কারণে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হতে পারে।
  • অসীম দায় এটা আবার একমালিকানা ব্যবসায়েও আছে। এটা অনেকে বুঝতে পারেন না। সহজ ভাষায় মনে করুন ব্যবসায়ে অনেক লস হয়েছে। এখন ব্যবসা উঠাতে গেলে আপনার যাবতীয় সহায় সম্পত্তি বিক্রী করতেও হতে পারে! যেটা কোম্পানির ক্ষেত্রে হয়না।

কোম্পানি কি, কোম্পানি তৈরি করতে কি কি লাগে,কোম্পানি ভালো নাকি অন্য ব্যবসায় ভালো এসব বুঝাতে পরবর্তীতে লিখবো। অনলাইন ব্যবসা শুরু করার পদ্ধতি নিয়ে আমাদের সাইটে লেখা হয়েছে। আগ্রহ থাকলে সেটাও পড়তে পারেন।

একমালিকানা ব্যবসায়ের সুবিধা অসুবিধা এবং অংশীদারি ব্যবসায়ের সুবিধা অসুবিধা তো আপনার কাছে পরিষ্কার হলো। এখন আপনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনার জন্য একমালিকানা ব্যবসা ভালো হবে নাকি অংশীদারি ব্যবসায় ভালো হবে। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়াটা একদম সহজ!

হ্যান্ডশেক

যদি আপনার মনে হয় কারো খবরদারি আপনার ভালো লাগবেনা,একা লাভ লোকসান বহন করবেন,কাউকে নিজের ব্যবসায় নাক গলাতে দিবেন না তাহলে একমালিকানা ব্যবসায় আপনার জন্য সঠিক। আর যদি মনে করেন এসব কোনো অসুবিধা নেই,আপনার ভালো লাভ দরকার,বড় বিজনেস দরকার,একা সবকিছু সামলানো আপনার জন্য কষ্টকর হবে তাহলে অংশীদারি ব্যবসায় করতে পারেন।

তাহলে আজকের মতো এতোটুকুই থাক।আর কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্স আছে ওখানে কমেন্ট করুন।আর নতুন কিছু নিয়ে জানার আগ্রহ থাকলে প্রশ্ন রেখে যান বক্সে। চেষ্টা করবো সে সম্পর্কীত কোনো লেখা প্রকাশ করতে। সহজভাবে।

পরিবার নিয়ে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আমাদের আরো ব্লগ পড়ুনঃ

ধন্যবাদ।