সৌদি আরব

সৌদি আরব সফর (মক্কা পর্ব)

ভ্রমণ বিদেশে
শেয়ার করুন

সৌদি আরব

সৌদি আরব যাবার আগে কিছু তথ্য জেনে রাখতে হবে,

  • ওখানের সাধারণ লোকজন ইংরেজিতে কথা বলতে পারেনা। অন্তত আমি কারো হেল্প পাইনি ইংরেজিতে।
  • ইংরেজি জানা লোকের চাইতে উর্দু জানা লোক বেশি মনে হয়েছে। তবে মক্কা আর মদিনায় পাকিস্তানিদের সংখ্যা বেশি হবার কারণে এটা হতে পারে। আবার আমার ধারণা ভুলও হতে পারে।
  • ওখানে মোটামুটি বাংলাদেশী, পাকিস্তানিদের দৌরাত্ম্য তুলনামূলক বেশি মনে হলো।
  • দেশীয় খাবারের প্রচুর হোটেল পাবেন।
  • সৌদি আরব মুসলিমদের যতটা ধর্মপ্রেমী মনে হয়, দেখার পর ততটা মনে হয়নি। আসলেই মনে হয়নি।
  • অপরিচিতজন দেশীয় মানুষ হলেও খুশি হবেন না। আলহামদুলিল্লাহ দেশীয় মানুষের হাতেই ঠক খেয়ে এসেছি। তবে এর মধ্যেও ভালো মানুষ আছে।
  • খাবারের দাম সৌদি রিয়েল হিসেবে মাপলে খুব কম মনে হবে। কিন্তু বাংলাদেশী টাকায় মাপলে অনেক বেশি। তবে সেই অনুযায়ী খাবারের মান এবং পরিমাণ দুইটাই ভালো।
  • সৌদি আরব দেশটিতে গরুর মাংসের চেয়ে উটের মাংসের দাম কম। ওখানে গেলে উটের মাংস খেয়ে আসবেন বেশি করে!
  • ওদের কালচার আর আমাদের কালচারে অনেক তফাৎ। ধরুন, কেউ নামাজ পড়লে আমরা সামনে দিয়ে সহজে যাইনা। ওরা এসব কেয়ার করেনা!
  • যে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে যাবেন আগে পরিষ্কারভাবে থাকা খাওয়ার ব্যাপারটা জেনে নিবেন। মক্কায় খুব বাজে হোটেলে উঠছিলাম।
  • ওখানে সবকিছুতেই এসি আছে। বাইরে গরম হলেও রুমের ভিতর অসুবিধা হবেনা। প্রথম প্রথম গরমটা একটু এড়িয়ে চলবেন।

সৌদি আরব এর নিয়ম কানুন

কাবা

সৌদি আরব খুব কড়াকড়ি করে নিয়মের ক্ষেত্রে। সাধারণ অপরাধ থেকে শুরু করে বড় অপরাধ সবকিছুকেই গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। তবে নিয়ম থাকলেও মানুষ নিয়ম ভাঙ্গে। যেমন, সৌদি আরব সিগারেট নিষিদ্ধ করলেও মানুষ সিগারেট পান করে। তবে আড়ালে আবডালে। অনেকে আবার পাবলিক প্লেসেও সিগারেট পান করে। তবে ধরা খেলে শাস্তি দেয়া হয়। জরিমানা বা জেলও হতে পারে।

রোড আইনে খুব কড়াকড়ি আছে। আমার এক বন্ধুর গাড়িতে উঠেছিলাম। সে ড্রাইভ করছিলো। মেইন রোডে উঠার সময় সম্ভবত গাড়ির হেডলাইট জ্বালায়নি। তাতেই প্রায় ৮০০ রিয়েলের মতো জরিমানা হয়েছিলো! বুঝতেই পারছেন সৌদি আরব নিয়মের ক্ষেত্রে কতটা সাবধান থাকে।

সফরের শুরুতে জেদ্দা থেকে মক্কা

সৌদি আরব টাওয়ার

সৌদি আরব সফরের শুরুতে জেদ্দায়  পৌছাই। সেখানে বিমান থেকে নামার পরপরই যে গরম বাতাস গায়ে লেগেছিলো তা বলে বুঝাতে পাবোনা! জ্বলন্ত চুলায় নেমে পরেছি মনে হয়েছিলো। যাবতীয় ভেরিফিকেশন শেষে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই সামনে পেয়ে যাই সিম কোম্পানির বিক্রেতাদের। তাদের সাথে কমিউনিকেশনের প্রবলেম হচ্ছিলো খুব বেশি।

সৌদি আরব গেলে ভাষাগত সমস্যার মুখোমুখি হতেই হবে! তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না, আমি আরবিতে কথা বলতে পারিনা। ব্যস। কেউ কারো কথা বুঝতে পারছিলাম না। তবে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত সিম নিতে পেরেছিলাম। টুকটাক অনেক অফারই দেয় ওরা। তবে ওদের ওখানে ইন্টারনেট খরচটা অতিরিক্ত মনে হয়েছে আমার কাছে। মোবাইলি, জেইন, এসটিসি অনেক কোম্পানি আছে।

তবে যেটাতে ডাটা বেশি অফার করবে এবং ডাটা খরচ কম হবে সেটা কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ওখানে বারবার রিচার্জ করার মতো বিরক্তিকর কাজটা করাটা আসলেই বিরক্তিকর! মোবাইলের খরচ অতিরিক্ত মনে হয়েছে আমার কাছে। তবে আমি সফরে গেছিলাম তাই সব জানিনা। হয়তো কম খরচের সিমও আছে।

তবে আপনাকে ওই দেশের ট্রাভেলার সিম দেয়া হবে। এটার মেয়াদ সম্ভবত ৩০-৬০ দিন পর্যন্ত থাকে। তারপর বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ সিম দেয়া হয়না হজ্জ্বযাত্রীদের। আমি যতটুক জেনেছি ততটুকু জানালাম। আরেকটা ব্যাপার, সেটা হলো সৌদি আরব যাবার আগে কারেন্সি কনভার্ট করে নিবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকেই কয়েক হাজার টাকা সৌদি রিয়েলে কনভার্ট করে নিবেন।

নাহলে ওখানে যেয়ে একটু প্রবলেমে পরতে পারেন। এতো ঘন্টার জার্নি শেষে ওখানে লাইন ধরাটা আরামদায়ক হবার কথা না! যাহোক, ওখানে সিম কেনার পরপর বাসে উঠে যাই। জেদ্দার বাদশাহ আব্দুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি মক্কা। এই জার্নিও প্রায় ৫ ঘন্টার মতো লেগেছিলো। সৌদি আরব সময় অনুযায়ী রাত ১ টার দিকে রওনা দিয়েছিলাম জেদ্দা থেকে। মক্কায় পৌছেছি সকাল ৬ টার পর।

মক্কায় পৌছানোর পর

মক্কা

মক্কায় বাস থেকে নামার পর আরেকবার একটা গরম বাতাসের ধাক্কা খেয়েছি। তখন ধীরে ধীরে সূর্য উঠা শুরু হয়। রাতের গরমটা মোটামুটি। কিন্তু দিনের গরমের অস্তিত্ব টের পেয়ে বুঝে গিয়েছিলাম যে দুপুরে সহ্য করা যাবেনা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো দুপুরের গরমটাও ধীরে ধীরে সহ্য হয়ে গিয়েছিলো।

যাহোক, বাস থেকে নেমে হোটেলে উঠি। হোটেলটা খুব একটা ভালো হোটেল ছিলোনা। বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে যদি হোটেলের বর্ণনা দিতে যাই তাহলে বিভিন্ন বোর্ডিং এর সাথে মিল পাওয়া যাবে। যদিও রুমের ভিতরের অবস্থা ভালোই ছিলো। তবে সেখানের বাথরুমের অভিজ্ঞতা আমি ভুলবোনা। উতরানো গরম পানি……!

তাই প্রথমেই বলে দিয়েছি যে ট্রাভেল এজেন্সির সাথে সবকিছুর ব্যাপারে কথা বলে নিবেন। টাকার টাকা ঠিকই দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাজে হোটেল ধরিয়ে দেয়ায় মুড নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। তবে মদিনায় আবার খুব ভালো হোটেলে উঠেছিলাম।

হোটেলে ফ্রেশটেশ হয়ে চলে গিয়েছিলাম তাওয়াফ করতে। জীবনের প্রথম ক্বাবা শরীফ দেখার অভিজ্ঞতা বলে বোঝানো যাবেনা। মনটা কেমন জানি খুব ভালো হয়ে গিয়েছিলো। শান্তি লাগছিলো অনেক। হাজারো মানুষ, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন রঙ, ভিন্ন রকম!

তাওয়াফ শেষে মাথার চুল ফেলে দিতে গেলাম দোকানে। মোটামুটি ওখানে সবাই উর্দুতে কথা বলছিলো। বেশিরভাগই পাকিস্তানি। প্রচুর বাংলাদেশীও ছিলো। সবাই উর্দুতেই কমিউনিকেট করছিলো। সেখানে চুল ফেলে দেয়ার পর হোটেলে গিয়ে গোসল করলাম। ফ্রেশ হয়ে একটা ঘুম দিলাম। এক ঘুমে দুপুর। উঠে খাওয়াদাওয়া করলাম। তারপর কিছুক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করে বাইরে বের হলাম মক্কা দেখতে।

একা একা আর কতদূর দেখা যায়! কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে আবার চলে আসলাম হোটেলে। তবে এই কিছু সময়ের মাঝেই কয়েকটা বাংলাদেশী দোকানে উঁকি দিয়েছিলাম। দেশী মানুষ বুঝলেই হলো। দাম কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে! দেশী মানুষ হিসেবে তাদের উপর বিশ্বাস তাকে বলেই মূলত এটা করতে পারে। তবে বাকি কয়েকটা দিন কিছু ভালো দেশী লোকের সাথেও দেখা হয়েছে। তারা ভালোই ছিলো।

সৌদি আরব এর খাওয়াদাওয়া

ক্বাবা

সৌদি আরব এর খাওয়াদাওয়ার খরচ মোটামুটি বেশিই বলা যায়। প্রায় ২০ রিয়েলে ভাত আর তরকারী নিতে হচ্ছিলো। বাংলাদেশী টাকায় যা একবেলায় প্রায় ৪৪০ টাকা! অনেক বেশি দাম নাকি ওখানের লোকগুলো এতো দাম রাখে বুঝতে পারছিলাম না।

তবে একটা ভুল করেছিলাম আমি। সেটা হলো শুধু দেশী খাবারই খেয়েছি। ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি বা যেকোনো দেশের খাবার টেস্ট করে আসা উচিত ছিলো। যদিও আসল স্বাদ পাওয়া যেতনা। তাও টেস্ট করলে ভালো লাগতো। এসব তখন মাথায় আসেনি। কারণ গিয়েছিলাম ওমরাহ করতে। ঘুরতে নয়। আমি এই লেখাটা যে লিখছি তার কারণ আরেকটা দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখতে আমার ভালো লাগছে তাই লিখছি।

খাবারের দাম বেশি হলেও প্রচুর খাবার দিতো। সৌদি আরব এর লোকরা নাকি প্রচুর খাবার নষ্ট করে। এটা আসলে তখন টের পেয়েছি। প্রয়োজনের বেশি খাবার দিলে নষ্ট হওয়াটা স্বাভাবিক। হোটেলেই যদি এভাবে দেয় তাহলে তাদের বাসা বাড়ির কি অবস্থা হতে পারে!

রমজান মাসের অভিজ্ঞতা

ক্বাবা শরীফ

আমি রমজান মাসে গিয়েছিলাম। ওখানে একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছে। রাস্তাঘাটে প্রচুর খাবার বিলি করা হয়। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, হুট করে দেখবেন একজন আপনাকে এসে খাবার দিয়ে গেছে!

এটা খুব ভালো। অভুক্ত থাকার ভয় নেই। আপনার পকেটে টাকা না থাকলেও খাবারের অভাব হবেনা। মক্কা মদিনা দুই জায়গাতেই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। সৌদি আরবের বাকি এলাকার কথা বলতে পারছিনা। এই লেখা চলবে। বাকি দুই লেখায় মদিনা আর তায়েফ সিটির অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। দেশের ভিতরে ঘুরাঘুরি করার লেখা পড়তে চাইলে এখানে ঘুরে আসুন।

আমাদের আরো ব্লগ পড়ুনঃ