মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং এর গুরুত্ব

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং এর গুরুত্ব

অন্যান্য ক্যারিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কি?

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বলতে একটা প্রতিষ্ঠানের জনশক্তিকে ওই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার করা।

ম্যানেজমেন্টের যে মূল ৫ টি অংশ রয়েছে এর মধ্যে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (Human Resource Management) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন সেটা একটু পরেই বলছি।

কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা সেবা পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ (সরকারী বা বেসরকারী অফিস, এনজিও ইত্যাদি) তাদের কাজ সম্পাদন করার জন্য নির্বাহী ও শ্রমিক সংগ্রহ, নির্বাচন, নিয়োগ, পদোন্নতি, ছাটাই করাসহ ইত্যাদি কাজ সঠিকভাবে করার জন্য মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক দের নিয়োগ দেন।

এটা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!

কারণ এরা উৎপাদনশীল এবং সেবা কাজে প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি জড়িত এবং এদের উপর প্রতিষ্ঠানের উন্নতি এবং অবনতি দুইটাই অনেকটাই নির্ভরশীল!

গ্যারি ডেজলার এর মতে, ” মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, বেতন ভাতা নির্ধারণ, মূল্যায়ন, শ্রম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং ন্যায় নিষ্ঠার সাথে সম্পকীত”

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের ব্যাখ্যা

উদাহরণের সাহায্যে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বুঝে নেই চলুন!

ধরুন ‘এবিসি’ একটা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে অনেক ডিপার্টমেন্ট আছে।

একাউন্টিং, ফাইন্যান্স, মার্কেটিং ইত্যাদি ডিপার্টমেন্ট রয়েছে।

এই ডিপার্টমেন্টগুলোর জন্য লোক লাগে।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা
প্রথমে জব এনালাইসিস করা হয়। ছবিঃআনস্প্লেশ

এই লোকদেরকে নিয়োগ দেয়া থেকে শুরু করে তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ, তাদেরকে ট্রেইন করানো, প্রয়োজনে ছাটাই করাসহ ইত্যাদি কাজগুলো করে থাকেন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক গণ।

আরেকটু সহজভাবে বোঝার জন্য এই কাজগুলোকে সিরিয়ালি বলছি যেন বুঝতে সুবিধা হয়।

এখন এই ‘এবিসি’ প্রতিষ্ঠানটির একটা পদ খালি হলো। যে পদটি খালি হলো সেই শূন্য পদটির জন্য তো এখন নতুন লোক লাগবে তাইনা?

এক্ষেত্রে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপগণ যে কাজগুলো করেন সেগুলো হলো,

  • প্রথমে জব এনালাইসিস করেন। যে পদটি খালি হয়েছে সেই পদের কাজ কি, সেই পদের জন্য কেমন লোক লাগবে, জবের রিকুয়ারমেন্ট, এপ্লিকেশন করার জন্য এপ্লিকেন্টের কোয়ালিফিকেশন সব এনালাইসিস করেন।
  • জব এনালাইজ শেষে জব পোস্টিং করেন। অর্থাৎ জবটির ব্যাপারে পত্রিকা বা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞপ্তি দেন। তারপর এপ্লিকেন্টরা তাদের এপ্লিকেশন বা সিভি জমা দিলে সেগুলোকে স্ক্রিনিং বা বাছাই করে শর্টলিস্ট তৈরি করেন। তারপর শর্টলিস্টেড এপ্লিকেন্টদের পরিক্ষা অথবা ভাইবা নেন। এটাকে রিকুটমেন্ট প্রসেস বলে।
  • তারপর সেখান থেকে পারফেক্ট পারসন নেন ওই শূন্য পদটির জন্য। একে বলা হয় সিলেকশন প্রসেস
  • তারপর তাদেরকে অরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে কাজ বুঝিয়ে দেয়া, ট্রেইন করানো, তাদের পারফর্মেন্স মূল্যায়ন করা, মোটিভেট করা, তাদের সেফটি নিশ্চিত করা, বেতন-ভাতা নির্ধারণ, শ্রমিক এবং মালিকের মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় ইত্যাদি কাজ করে থাকেন।
  • আবার প্রয়োজনে কর্মী ছাটাইয়ের কাজও করে থাকেন।

এই কাজগুলোকে এইচ আর একটিভিটিজ বলে।

আর এসব কাজের মাধ্যমে লোকবলকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক ভাবে ব্যবহার করাই হলো মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা। উপর্যুক্ত কাজগুলো করা হয় যেন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সঠিকভাবে পূরণ হয়।

আর এসব কাজ বা একটিভিটিজগুলো যারা করেন তারাই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক বা এইচ আর বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার জনক কে?

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই ধারনার জন্ম হয়েছিলো। আর ধারণাটা এসেছিলো ফ্রেডরিক উইনস্লো টেইলরের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা তত্ব থেকে।

ট্রেনিং
হাতে কলমেও ট্রেনিং করানো হয়। ছবিঃআনস্প্লেশ

তখন সারা বিশ্বে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। আর ওই সময়ে তুমুল প্রতিযোগীতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে তারা অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠানের বাইরের লোকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে থাকে।

এতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তুষ্টির জন্ম নেয়।

এরপরই মূলত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্ম নেয়। আর বর্তমানে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

এরপর বিংশ শতাব্দীর মাঝামঝিতে এসে এলটন মেয়ো এই ধারণাকে পূর্ণাঙ্গতা দান করেন।

আর এই জর্জ এলটন মেয়োকেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

প্রতিটা পণ্য উৎপাদনের পেছনে মানুষের হাত রয়েছে।

আপনি একটা যন্ত্রকে দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ করাতে পারবেন দ্রুত। কিন্তু যখন ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল কাজের প্রয়োজন হয় তখন মানুষ ছাড়া করা সম্ভব না।

কারণ যন্ত্র তাকে সেট করে দেয়া কাজের বাইরে কিছুই করতে পারেনা।

স্ট্রাটেজি
এইচ আর এম কোম্পানিকে কম্পেটিটিভ এডভান্টেজ দেয়। ছবিঃআনস্প্লেশ

আর উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত মানুষের হাত থাকে।

ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। এটাকে ৫এম বলে।

এগুলো হলো ম্যান,মানি,মেথডস,মেশিন এবং মেটারিয়াল

এই ৫ টি অংশের মধ্যে সবার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ম্যান বা মানুষ।

আর এটার সাথেই ডিল করতে হয় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপকদের।

এটাকে কঠিন বলার কারণ, মেশিন তাকে সেট করে দেয়া কাজের বাইরে কিছু করতে না পারলেও মানুষ পারে!

উপর্যুক্ত অংশগুলোর বাকি সবগুলোই জড়বস্তু। কিন্তু মানুষের মন আছে, মানুষ চিন্তা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ভিন্ন মানুষ ভিন্ন রকমের হয়। কেউ বেশি বেতন পেলে খুশি হয়, কেউ চাকরির নিরাপত্তা পেলে খুশি হয়, কেউ আবার ট্রাভেলিং সুবিধা দিলে খুশি হয়।

আবার একটা মানুষ চাইলে প্রতিষ্ঠানের আরো ১০ টা শ্রমিককে উষকে কর্মক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু যন্ত্র তা পারেনা।

এজন্যই মানুষকে নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে কঠিন।

আর এই মানুষকে নিয়েই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপকদের কাজ!

তাই এটার গুরুত্ব বুঝতেই পারছেন আশা করি।

বইয়ের ভাষায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা এর গুরুত্ব

আমিতো আমার ভাষায় এর গুরুত্ব বলেছি। অনেকে আবার বইয়ের ভাষায় জানতে চান। তাদের জন্য এই সেকশন।

নিম্নে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো,

মানব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারঃ একটা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মানব সম্পদ। এটার উপর প্রতিষ্ঠানের উন্নতি এবং অবনতি দুইটাই নির্ভর করে। তাই এটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। আর এটার জন্যই হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন।

বস্তুগত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারঃ মানুষকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে জড়পদার্থ বা বস্তুগত সম্পদগুলোর কর্মক্ষমতাও বেড়ে যায়! কারণ মানুষ সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে যন্ত্রও কাজ করতে বাধ্য!

কর্মীর দক্ষতা উন্নয়নঃ হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কাজকে আরো উন্নত করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি দ্রুত হয়।

ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করাঃ বর্তমানের মানব সম্পদকে কিভাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আরো উন্নত করা যায় সেই চেষ্টা করে থাকেন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপকরা। এজন্য বর্তমান ছাড়াও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গ্রহন করা যায়।

প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহঃ প্রতিষ্ঠানের জন্য কেমন লোক লাগবে সেই মোতাবেক লোক নিয়োগ করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের ভালো করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

সমন্বয় সাধন করাঃ বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের মধ্যকার সমন্বয় সাধন এবং সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজাররা।

মজুরী বা বেতন-ভাতা নির্ধারণঃ প্রতিষ্ঠানের কর্মী অথবা শ্রমিকদের বেতন ভাতা নির্ধারন করতে কাজ করেন উনারা। এতে বেতন ভাতা নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়না। তবে বাংলাদেশে এই সমস্যার তেমন সুরাহা হয়েছে বলে মনে হয়না। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এসব সমস্যা তেমন না হলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রচুর সমস্যা এখনো আছে।

এটাকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট নামে কেন ডাকা হয়?

এখানে তিনটা শব্দ রয়েছে।

মানব(Human), সম্পদ(Resource) এবং ব্যবস্থাপনা(Management)।

মানব(Human) অর্থ প্রতিষ্ঠানের জন্য স্কিলড কর্মী, নির্বাহী ইত্যাদি। এখানে মানব মানে শুধু মানুষকেই বোঝানো হচ্ছেনা। বোঝানো হচ্ছে স্কিলড মানুষ।

সম্পদ(Resource) অর্থ যা সাধারণত কম পাওয়া যায়। কোটি কোটি মানুষ আছে পৃথিবীতে। তবে স্কিলড মানুষের খুব অভাব।

ব্যবস্থাপনা(Management) অর্থ হলো এই মানব সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা।

অর্থাৎ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মানে স্কিলড মানুষকে আরো স্কিলড করে গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন করতে সাহায্য করা।

নামটা এভাবেই এসেছে।

বাংলাদেশে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা র বিস্তৃতি একটু ধীর গতিতে আগাচ্ছে। আশা করা যায় এর গতি আরো বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্কিলড লোক নিয়োগ দিয়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।

আমি চিন্তা করেছি এইচ আর এম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখবো এবং ভিডিও পাবলিশ করবো।

আজকের যে নামগুলো বলেছি যার ব্যাখ্যা দেইনি সেগুলো নিয়ে সিরিজ আকারে ভিডিও দিবো এবং লেখাও পাবলিশ করবো।

আমার আরো লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *