পদ্মা সেতু তৈরির ইতিহাসের সাক্ষী হতে গিয়েছিলাম

পদ্মা সেতু তৈরির ইতিহাসের সাক্ষী হতে গিয়েছিলাম

দেশে ভ্রমণ
Spread the love

পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক কথাবার্তা শুনেছেন নিশ্চয়?

অনেকে বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু যারা এটা সম্পর্ক বিস্তারিত জানেন তারা বিরক্ত হবার কথা না।

কারণ বাংলাদেশ তথা অনেক দেশের জন্য এটা অনেক বড় উদাহরণ! খরস্রোতা পদ্মার বুকে একটা সেতু যে কতবড় অর্জন তা জানতে হলে অনেক তথ্য জানতে হবে আপনাকে। এই লেখার শুরুতে কিছু তথ্য জানিয়ে দেই আপনাকে,

  • এটা পদ্মা নদীর উপর নির্মিত বহুমূখী সড়ক ও রেলসেতু।
  • এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের সাথে মাদারিপুর ও শরিয়তপুর জেলা যুক্ত হবে।
  • এটার মাধ্যমে দেশের উত্তর-পূর্ব অংশের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সংযোগ ঘটবে যেটা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিলো!
  • বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ধরা হচ্ছে এই নির্মানকে!
  • এটা দুই স্তরের। উপরের অংশে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের অংশে একক রেলপথ রয়েছে।
  • পদ্মা সেতুর মোট স্প্যান ৪১ টি।
  • পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ১৬.১৫০ কিলোমিটার।
  • এর প্রস্থ ১৮.১০ মিটার।
  • পদ্মা সেতুর নির্মানকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’।

আরো তথ্য পেতে এখানে দেখুন।

আর নিচের ভিডিওটি আপনার ভালো লাগবে। কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া ব্রিজ!

পদ্মা সেতু এর উদ্দেশ্যে ঢাকার পথে যাত্রা

পদ্মা সেতু দেখতে যাবো চট্টগ্রাম থেকে। ঢাকা হয়ে যেতে হবে। আমি, মামা আর মামাতো ভাই মাত্র তিনজন ছিলাম সেই যাত্রায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রওনা দিয়েছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব মোটামুটি ২২ কিলো হবে। এই পথটুকু পাড়ি দিতে প্রায় ঘন্টার মতো লেগে যায়।

রাত ১২ টার দিকে ঢাকার বাস। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম ৯ টা বাজে।
প্রায় ১০/১০.১০ এর মধ্যেই পৌছে যাই চট্টগ্রাম শহরে। হাটহাজারীর দ্রুতযান নামে একটা ননস্টপ বাস আছে। ভাড়া ৩০ টাকা।
ওই বাস দিয়েই আসা যাওয়া করি। একটানে আসা যাওয়া করা যায়। আমার আবার বারবার গাড়ি থামানোর ব্যাপারটা পছন্দ না।তাই আরকি।

যাহোক, শহরের মুরাদপুর এলাকায় নেমে খাওয়াদাওয়া করে নেই। হাজী বিরিয়ানিতে খেয়েছিলাম। ওদের মেন্যুতে করোনার পর বিশাল পরিবর্তন এসেছে মনে হলো।

শুধু চট্টগ্রামের গুলোতেই এই পরিবর্তন এসেছে নাকি পুরো বাংলাদেশের হাজী বিরিয়ানিতে পরিবর্তন এসেছে সেটা জানিনা। অন্য এলাকায় এই পরিবর্তন চোখে পড়লে মন্তব্য করবেন।

ওখানে খাওয়াদাওয়া সেরে রিকশা নিয়ে চলে গেলাম দামপাড়া বাসট্যান্ড। আমাদের বাসটি ওখান থেকেই ছাড়বে। ওখানে সময়ের আগেই পৌছে গিয়েছিলাম।

তাই একটু এদিক সেদিক হাটাহাটি করতে হয়েছিলো। চা খেয়ে নিয়েছিলাম দুই কাপ! আমার হিসেবে একটু বেশিই। আমি চা খেতে পছন্দ করি। তবে একসাথে দুই কাপ খাওয়াটা বিরক্তিকরই!

যথাসময়ে বাস ছাড়লো। চট্টগ্রাম-ঢাকা এখন খুব কম সময় লাগে। একেবারে ভোরে পৌছে যাবে এটা বুঝাই যাচ্ছিলো। প্রায় ঘন্টাখানেক মোবাইল ব্যবহার করে একসময় ঘুম পেলো। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম।

কুমিল্লায় বাস থামার পর নাস্তা খাওয়ার জন্য নামলাম। বিশ্বাস করুন এই বছরের সবচেয়ে ভয়ানক ঠান্ডা অনুভব করলাম!চট্টগ্রামে এবার খুব কমই ঠান্ডা পড়েছে। কুমিল্লায় তো দেখলাম ভয়ানক অবস্থা!

প্রচন্ড ঠান্ডা!

যাহোক, নাস্তা করে বাসে উঠে আবার ঘুম দিলাম। ঘুম দেয়ার বিবরণ দিয়ে আপনাদেরকে বিরক্ত করার প্রয়োজন নেই মনে হচ্ছে। বেশি বিরক্ত করলে মনে মনে বিরক্ত হতে পারেন!

ঢাকায় পৌছালাম

ঢাকায় সকাল ৫ টার দিকে পৌছালাম। যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নিচে নেমে কিছুক্ষণ সামনে হেটে মোড়ের দিকে গেলাম। যাবার পথে সুন্দর একটা দৃশ্যের দেখা পেলাম। মাছের আড়তগুলা প্রচুর ব্যস্ত। এই সময় যেখানে সবাই ঘুমানোর কথা সেখানে যাত্রাবাড়ির মাছের আড়তে দেখলাম সবাই প্রচুর ব্যস্ত! হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে এই সময়টাতে!

পদ্মা নদী
পদ্মার নদীর মাঝি!

যাহোক, কিছুক্ষণ হেটে মোড়ে পৌছালাম। ‘ইলিশ পরবিহন’ দিয়ে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু সেখানে এই বাস পেলাম না। অন্যান্য দুই একটা লোকাল বাসের দেখা পেলাম। উঠে পড়লাম। যত দ্রুত যাওয়া যায় আরকি।

কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই বাসে উঠে ভুল করে ফেলেছিলাম! এতো বিরক্তিকর যাত্রা ছিলো! একটা বাসে সাধারণত ৪০ টার আশেপাশে সিট থাকে। এই বাসে মনে হলো কমপক্ষে ৬০ টা সিট। আর সিটগুলো তো অসহ্য!

এগুলা বলে আর কি হবে। যা হবার হয়েছে। কোনোমতে মাওয়া ঘাটে পৌছাতে পারলেই হলো। ঢাকা টু মাওয়া রাস্তাকে ধরা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা।

কিন্তু আফসোস!

এই রাস্তা দেখার সৌভাগ্য আর হয়নি। এতো পরিমাণ কুয়াশা ছিলো, মাত্র ১০ হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছিলোনা। ঢাকা থেকে মাওয়া ঘাটের দূরত্ব প্রায় ১-১.৩০ ঘন্টার। সেখানে আমাদের সময় লেগেছে প্রায় ২ ঘন্টা।

বাস থেকে নামার পর বুঝে গিয়েছিলাম এই যাত্রা সামনে আরো অসহ্য হতে যাচ্ছে। একদিকে ঘন কুয়াশা, আরেকদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা! এই দুইয়ে মিলে একেবারে কাবু করে ফেলেছে।

মাওয়া ঘাট

মাওয়া ঘাটে নেমে সবার আগে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর একটু হোটেলে বসে নাস্তা খেয়ে নিলাম। ঘাটে সম্ভবত পাশাপাশি দুইটা হোটেলই ছিলো। আর অন্য হোটেল থাকলেও তা চোখে পড়েনি। একটা হোটেলে নাস্তা খেয়ে অনেক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে।

বাইরে কুয়াশার প্রকোপ কমছিলোনা। প্রায় ৮ টা বাজে কিছুটা কমার পর একটা লঞ্চে উঠলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম স্পিড বোট দিয়ে যাবো।

তবে ওখানের স্পিড বোটগুলো আমাদের কাছে রিস্কি মনে হচ্ছিলো। ছোট একটা স্পিড বোটে প্রায় ২২ জন নিচ্ছে। বড় স্পিড বোটে প্রায় ৩২ জন! লঞ্চের ভাড়া যেখানে ৩৫ টাকা সেখানে স্পিড বোটের ভাড়া ১৫০ টাকা।

যাদের তাড়া আছে তাদের জন্য স্পিড বোট ঠিক আছে। কিন্তু আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম, তাড়াহুড়ার প্রশ্নই আসেনা।

লঞ্চে উঠার আগে টিকিট কাটতে হয়নি। লঞ্চ ছাড়ার একটু পর দুইজন লোক এসে টাকা নিয়ে টিকিট হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো।

পদ্মা সেতু দেখা

মজার ব্যাপার হলো মাওয়া থেকে জাজিরা যাবার পথে দুইবার পদ্মা সেতুর দেখা পেয়েছিলাম আমরা। ঘন কুয়াশার কারণে সারেং পথ হারিয়ে ফেলেছিলো সম্ভবত। শুধু আমরা না। আমাদের সাথে আরো দুইটা লঞ্চ পথ হারিয়েছিলো।

পদ্মা সেতু দেখে মন অনেক ভালো হয়ে গিয়েছিলো। এতো যন্ত্রণার জার্নিটা নিমেষেই ভালো লাগায় পরিণত হয়েছিলো। স্বপ্নের পদ্মা সেতু! আর কয়েক বছর পরেই এটার উপর দিয়ে কত হাজার হাজার গাড়ি যাবে! পদ্মার ওপাড়ের লোকদের জন্য এটা আশীর্বাদ।

তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এই সেতু। তেমন ছবি তুলতে পারিনি। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছিলাম তা পূরণ হয়েছে। ভিডিও করার প্ল্যান নিয়ে গিয়েছিলাম। তা করতে পেরেছি।

তবে দুঃখের কথা, চেয়েছিলাম পরিষ্কার আকাশ। কিন্তু পেয়েছি ঘন কুয়াশাভরা আকাশ। ভিডিও দেখলেই বুঝতে পারবেন। তবে ফেরার পথে রোদ থাকায় সেই কষ্ট লাঘব হয়েছিলো। এটা ঠিক যে ঘন কুয়াশা থাকার কারণে পরিষ্কার দৃশ্যের থেকেও সুন্দর দৃশ্য পেয়েছি। মনে হচ্ছিলো একটু দূরেই পদ্মা সেতুটি গায়েব হয়ে গেছে!

জাজিরার অভিজ্ঞতা

কুয়াশার কারণে ২ ঘন্টা লেগে যায় জাজিরা ঘাটে পৌছাতে। সাধারণত ১ ঘন্টার মতো সময় লাগার কথা ছিলো।
জাজিরা ঘাটে নেমে অবাক হয়েছি অনেকটা। মনে হচ্ছিলো ৩০/৪০ বছর পুরোনো বাংলাদেশে এসে পড়েছি। এই বাজার দেখে বুঝে গিয়েছি এদিকের জনপদ ওপাড় থেকে কতটুকু পিছিয়ে আছে!

পদ্মা সেতু
ঘন কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া পদ্মা সেতু!

জরাজীর্ণ সব দোকানপাট, ভাঙ্গা এবং পুরোনো বাস,সিএনজি। সত্যিকার অর্থেই পদ্মা সেতুর খুব প্রয়োজন ছিলো।
আলহামদুলিল্লাহ এখন সেটা হয়েছে। আশা করা যায় এদিকের মানুষ খুব বেশি লাভবান হবে। তবে এমনও হতে পারে এদিকে শুধু জাজিরা ঘাটেরই এমন অবস্থা।

অন্যান্য দিকে আরেকটু উন্নত হতেও পারে। আমার ওই দিকটাতে কখনো যাওয়া হয়নি। তাই বলতে পারছিনা ওদিকের কি অবস্থা।

জাজিরা ঘাটে নেমে আমরা কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে নিলাম। এদিকে সবজির দাম তুলনামূলক অনেক কম। এদিকের বিক্রেতারা ওপাড়ে যে ভাড়া দিয়ে যাবে তাতে পোষানোর কথা না। এই সাইডে তাই একটু কম লাভ হলেও বিক্রী করতে হচ্ছে।

হাটাহাটির এক পর্যায়ে মনে হলো গরুর দুধের চা খাই। মোটামুটি এরকম এলাকাগুলোতে গরুর দুধের চা পাওয়ার কথা। খোঁজ নিয়ে একটা দোকানে গেলাম। দোকান না আসলে, টং দোকান বলা যায়। ওখানে বসে দোকানদারের সাথে গল্প করলাম কিছুক্ষণ।

স্পিড বোটের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে উনি বললো যখন পানি কম থাকে(শীতকাল) তখন বেশি দূর্ঘটনা হয়।
কারণ স্পিড বোটের ড্রাইভাররা শান্ত পানি পেয়ে খুব দ্রুত চালায়। যার কারণে দূর্ঘটনার সম্ভাবনাও থাকে অনেক বেশি।

এই কথা শুনে আমার মামা লঞ্চে ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমাদের প্ল্যান ছিলো, যেহেতু লঞ্চ দিয়ে এসেছি সেহেতু স্পিড বোট দিয়েই ব্যাক করবো। দুইটার স্বাদই নেয়া উচিত।

তবে আবার লঞ্চ দিয়ে ব্যাক করতে গিয়ে বুঝলাম এই সিদ্ধান্তই সঠিক ছিলো। লঞ্চ ধীরে ধীরে চলে বলে কিছু ভালো ফুটেজ নিতে পেরেছিলাম। বেশি গতিতে আসলে তো সেটা সম্ভব হতোনা।

সফরের উপসংহার

পদ্মার বুকে লঞ্চে বেড়ানো, পদ্মা সেতুর মতো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকাটা আসলে দূর্দান্ত! হতে পারে আমার এই অভিজ্ঞতার লেখাটা ২০/৩০ বছর পর কারো চোখে পড়তে পারে। এটাই তো সুন্দর!

সর্বনাশা পদ্মার বুকে আশা জেগেছে।আশা জেগেছে জাজিরা পরবর্তী বাংলার মানুষের।
আশা করি বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে।
আরো উন্নত হবে।
এই কামনায় আমার আজকের লেখা সমাপ্ত হলো।

আমার আরো লেখা পড়তে এই লিংকে ঘুরে আসুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *